শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

যাকাত ( زكاة ) পরিচিতি, ফরজ হওয়ার শর্তাদি, নিসাব, যাকাতের ৮টি খাত, যাকাত না দেয়ার ক্ষতি ও উপকারিতা


যাকাত ( زكاة ) পরিচিতি                               

যাকাত হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি। আরবি শব্দ زكاة (zakat) যার অর্থ পরিশুদ্ধ করে। প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতি বছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে, গরীব-দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়। সাধারণত নির্ধারিত সীমাতিক্রমকারী সম্পত্তির ২.৫ শতাংশ (২.৫%) বা (১/৪০) অংশ বছর শেষে বিতরণ করতে হয়।

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ্জ্ব এবং যাকাতই শুধুমাত্র শর্তসাপেক্ষ যে, তা সম্পদশালীদের জন্য ফরয বা আবশ্যিক হয়। উল্লেখ্য, নিসাব পরিমাণ হলেই যাকাত কোনো ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হয় এবং তখন তার উপর 'যাকাত' নামক ফরয বর্তায়; অর্থাৎ যাকাত আদায় করা ফরয। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে "যাকাত" শব্দের উল্লেখ এসেছে ৩২ বার।কুরআনে নামাজের পরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পূর্ন বিষয় হিসাবে উল্লেখ এই যাকাত।



যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত                               

কোন ব্যক্তির ওপর ইবাদত ফরজ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত থাকে। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্যও কিছু শর্ত আছে। এগুলোর মধ্যে কিছু শর্ত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার যাকাত আর্থিক ইবাদত হওয়ায় সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু শর্তও আছে। শর্তগুলো হলো-

১। মুসলিম হওয়া : যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো মুসলিম হওয়া। যাকাত মুসলিমদের ওপর এক প্রকারের ইবাদত বিধায় তা অমুসলিমদের জন্য ফরজ হওয়ার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

২। বালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া : শাফি’ঈ, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাব মতে, সম্পদশালী শিশুর ওপর যাকাত ফরজ হবে। তার সম্পদ হতে তার ওয়ালী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক যাকাত আদায় করবেন। হানাফী মাযহাব মতে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে শিশুর সম্পদে যাকাত নেই। শিশুর সম্পদে যাকাত ফরজ না হওয়ার পক্ষে তাদের দলিল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন প্রকারের মানুষের ওপর হতে তাকলীফের কলম তুলে নেয়া হয়েছে- পাগল, যতক্ষণ না তার জ্ঞান ফিরে আসে; ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয় এবং শিশু যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়’ (জামে আত তিরমিযী)। তাছাড়া যাকাত এক প্রকারের ইবাদত বিধায় শিশুর ওপর তা ফরজ হবে না, যেমন সালাত ও রোযা শিশুর ওপর ফরজ হয় না (আল-কাসানী)। তবে অধিকাংশ আলেমদের মতে শিশুদের যাকাত পরিশোধ করাই অধিকতর দলিলসম্মত।

৩। বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া : হানাফী মাযহাব মতে, যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই পাগলের ওপর যাকাত ফরজ নয়। যুক্তি হিসেবে তাঁরা তিন প্রকারের ব্যক্তির ওপর তাখলীফের কলম তুলে নেয়ার হাদীসটি উল্লেখ করেন। অন্যান্য মাযহাব মতে, পাগলের ওপর যাকাত ফরজ হবে, তার পক্ষ হতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক যাকাত আদায় করবেন।

৪। স্বাধীন ব্যক্তি হওয়া : যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকের স্বাধীন হওয়া অন্যতম শর্ত। এ কারণে দাসের ওপর যাকাত ফরজ নয়। বস্তুতপক্ষে দাস কোনো সম্পদের মালিক নয়, তার সব সম্পদের মালিক তার মনিব। তাই তার ওপর যাকাত ফরজ হওয়ার কোন প্রশ্ন নেই।

৫। নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা : যাকাত ফরজ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। শরীয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদকে নিসাব বলে। যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত ফরজ হয়। এ সম্পদগুলো হলো নগদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগকৃত টাকা, স্বর্ণ, রৌপ্য, শস্য ও প্রাণী।

৬। সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা : যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের ওপর মালিকানা ও পূর্ণাঙ্গ দখল থাকতে হবে এবং সম্পদ ব্যবহারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে, অন্যথায় যাকাত ফরজ হবে না। যেমন জনকল্যাণে ওয়াকফকৃত সম্পদে যাকাত নেই। তবে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ওয়াকফ করা হলে তার যাকাত দিতে হবে।

৭। যৌথ মালিকানাভুক্ত সম্পত্তির যাকাত : কোন সম্পদের দুই বা ততোধিক মালিক থাকলে প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশের যাকাত দেবেন। যদি প্রত্যেক মালিকের অংশ আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ না হয় তাহলে কাউকে যাকাত দিতে হবে না। যদি কারো অংশ নিসাব পরিমাণ হয় তবে তাকে যাকাত দিতে হবে।

৮। হারাম সম্পদের যাকাত : চুরি, ডাকাত, সুদ, ঘুষ, ছিনতাই, রাহাজানি, অবৈধ ব্যবসা ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ হারাম বা অবৈধ সম্পদ বলে গণ্য। হারাম পন্থায় উপার্জনকারী ব্যক্তি ওই সম্পদের মালিক নয়। অতএব, তা খরচের অধিকারও তার নেই। যাকাত প্রদানও এক ধরনের খরচ।

৯। সম্পদ বর্ধনযোগ্য হওয়া : যাকাত ফরজ হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দরিদ্রকে সহযোগিতা এবং তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা। কিন্তু নিশ্চয়ই আল্লাহ চান না যে, যাকাত আদায় করে ধনী ব্যক্তি দরিদ্র হয়ে যাক। সম্পদ যদি বর্ধনশীল না হয় এবং তা হতে বছরের পর বছর যাকাত আদায় করা হতে থাকে, তাহলে ধনী ব্যক্তি এক সময় দরিদ্র্য হয়ে যাবে। তাই যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া অপরিহার্য।

১০। সম্পদ একবছর অধিকারে থাকা : কোন সম্পদ যদি এক বছরের কম সময়ে হাতে থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে না। এ শর্তটি নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য, চতুষ্পদ জন্তু ও ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একবছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোন সম্পদে যাকাত নেই’। (সুনানে আবু দাউদ)

১১। সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া: হানাফী মাযহাবের আলিমগণ যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য অতিরিক্ত একটি শর্তারোপ করেন, সেটি হলো যাকাতযোগ্য সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয় না। যে ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নেই তাকে ধনী বলা যায় না। আর যাকাত ফরজ করা হয়েছে ধনীদের ওপর। রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে মু’আয (রা.)কে বলেছিলেন, ‘এটি ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করতে হবে।’ (সহীহ আল বুখারী)

১২। ঋণমুক্ত হওয়া : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সম্পদের প্রথম হকদার হলো পাওনাদার। তাই প্রথমে ঋণ আদায় করতে হবে। অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কারো ওপর ঋণ থাকলে সে যেন প্রথমে তা শোধ করে, তারপর বাকি সম্পদের যাকাত আদায় করবে।’ (মুয়াত্তা)

১৩। মৃত ব্যক্তির যাকাত : কোনো ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে কিন্তু তিনি তা আদায় না করে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাহলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ হতে ওয়ারিশগণ বা সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক যাকাত আদায় করবেন।

১৪। বহির্বিশ্বে রক্ষিত সম্পদের যাকাত : কারো সম্পদ যদি বিদেশের ব্যাংকে থাকে কিংবা কেউ যদি বিদেশে ব্যবসা করেন এবং ওই সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়, তবে তাকে যাকাত আদায় করতে হবে। বিদেশে শরীয়াহ নির্ধারিত খাতে যাকাত বণ্টন করার সুযোগ থাকলে তিনি সেখানে বণ্টন করতে পারবেন, অন্যথায় নিজ দেশে যাকাত আদায় করবেন।

১৫। কয়েদি বা সাজাপ্রাপ্ত আসামীর যাকাত : কারাদণ্ড বা বন্দিদশা যাকাত রহিত করে না। কারাবন্দী সে হাজতি হোক বা সাজাপ্রাপ্ত হোক নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকে যাকাত দিতে হবে। তার পক্ষ হতে তার পরিবারের সদস্য বা তার সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক যাকাত আদায় করবেন। যদি তা না হয় মুক্তিলাভের পর পূর্বের বছরগুলোর যাকাত তাকে হিসাব করে আদায় করতে হবে।

১৬। মুসাফিরের যাকাত : সফরের কারণেও যাকাতের বিধান রহিত হয় না। মুসাফির ব্যক্তি (সফরকারী ব্যক্তি) যদি নিজ দেশে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তাহলে ওই সম্পদের যাকাত দিতে হবে। এটা সত্য যে, সম্পদশালী মুসাফিরও যদি বিদেশে বিপদগ্রস্ত হন তাহলে তিনি যাকাত গ্রহণ করতে পারেন। তাই বলে এ বিধানের বলে দেশে রক্ষিত সম্পদের ওপর যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হয় না।



নিসাব                                

নিসাব (نصاب الزكوة)আরবি শব্দ। ইসলামী শরিয়তের পারিভাষায় যাকাতের নিসাব হলো যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ। নিসাবের বিবরণ- যেই পরিমাণ সম্পদ হলে যাকাত ফরজ হবে তাকে নিসাব বলে।

০১. স্বর্ণের ক্ষেত্রে যাকাতের নিসাব হল বিশ মিসকাল, আধুনিক হিসাবে সাড়ে সাত ভরি (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদীস ৭০৭৭,৭১০৪)।

০২. রূপার ক্ষেত্রে নিসাব হল দুইশত দেরহাম। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৭৯) আধুনিক হিসাবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা। এ পরিমান সোনা রূপা থাকলে যাকাত দিতে হবে।

০৩. প্রয়োজনের উদ্ধৃত্ত টাকা-পয়সা বা বানিজ্য দ্রব্যের মুল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমপরিমাণ হয় তাহলে যাকাতের নেসাব পূর্ণ হয়েছে বলে ধরা হবে এবং এর যাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হাদীস ৯৯৩৭)।

০৪. যদি সোনা- রূপা, টাকা-পয়সা, কিংবা বাণিজ্য দ্রব্য এগুলোর পৃথকভাবে নেসাব পরিমান না থাকে, কিন্তু এসবের একাধিক সামগ্রী এ পরিমান রয়েছে যা একত্র করলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমমূল্য বা তার চেয়ে বেশি হয় তাহলে এক্ষেত্রে সকল সম্পদ হিসাব করে যাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস ৭০৬৬,৭০৮১)।

০৫. নিসাবের অতিরিক্ত সোনা-রূপা, টাকা-পয়সা ও বাণিজ্য পণ্যের যাকাত আনুপাতিক হারে দিতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হাদীস, ৬/৩৯০)

০৬. কারো কাছে সোনা-রূপা, টাকা-পয়সা কিংবা বাণিজ্য দ্রব্য পৃথকভাবে বা সম্মিলিতভাবে নিসাব পরিমান ছিল, বছরের মাঝে এ জাতীয় আরো কিছু সম্পদ কোন সুত্রে পাওয়া গেল। এ ক্ষেত্রে নতুন পাওয়া সম্পদ পুরাতন সম্পদের সাথে যোগ হবে এবং পুরাতন সম্পদের বছর পর সমুদয় সম্পদের যাকাত দিতে হবে। বছরের মাঝে যা যোগ হয়েছে তার জন্য পৃথক বছর পূর্ণ হওয়া লাগবেনা । (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদীস ৬৮৭২, ৭০৪০, ৭০৪৪)

০৭. বছরের শুরু ও শেষে নেসাব পূর্ণ থাকলে যাকাত আদায় করতে হবে। মাঝে নিসাব কমে যাওয়া ধর্তব্য নয়। অবশ্যই বছরের মাঝে সম্পূর্ণ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় যদি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয় তাহলে ঐ সময় থেকে নতুন করে বছরের হিসাব আরম্ভ হবে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর যাকাত আদায় করতে হবে।

                                

যাকাত বন্টনের নির্ধারিত ৮টি খাতের বিবরণ :

প্রথম খাত : ফকির- ফকির হলো সেই ব্যক্তি যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। যে ব্যক্তি রিক্তহস্ত, অভাব মেটানোর যোগ্য সম্পদ নেই, ভিক্ষুক হোক বা না হোক, এরাই ফকির। যেসব স্বল্প সামর্থ্যের দরিদ্র মুসলমান যথাসাধ্য চেষ্ট করা সত্ত্বেও বা দৈহিক অক্ষমতাহেতু প্রাত্যহিক ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারে না, তারাই ফকির। কারো মতে যার কাছে একবেলা বা একদিনের খাবার আছে সে ফকীর।

দ্বিতীয় খাত : মিসকীন - মিসকীন সেই ব্যক্তি যার কিছুই নেই, যার কাছে একবেলা খাবারও নেই। যেসব লোকের অবস্থা এমন খারাপ যে, পরের নিকট সওয়াল করতে বাধ্য হয়, নিজের পেটের আহারও যারা যোগাতে পারে না, তারা মিসকীন । মিসকীন হলো যার কিছুই নেই, সুতরাং যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ অর্থ সম্পদ নেই, তাকে যাকাত দেয়া যাবে এবং সেও নিতে পারবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, ফকির বা মিসকীন যাকেই জাকাত দেয়া হবে, সে যেন মুসলমান হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়।

তৃতীয় খাত : আমেলীন- ইসলামি সরকারের পক্ষে লোকদের কাছ থেকে যাকাত, উসর প্রভৃতি আদায় করে বায়তুল মালে জমা প্রদান, সংরক্ষণ ও বন্টনের কার্যে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। এদের পারিশ্রমিক যাকাতের খাত থেকেই আদায় করা যাবে। কোরআনে বর্ণিত আটটি খাতের মধ্যে এ একটি খাতই এমন, যেখানে সংগৃহীত যাকাতের অর্থ থেকেই পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এ খাতের বৈশিষ্ট্য হলো এতে ফকীর বা মিসকীন হওয়া শর্ত নয়। পক্ষান্তরে, অবশিষ্ট ৫টি খাতে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থ দূরীকরণে যাকাত আদায় শর্ত।

চতুর্থ খাত : মুমু'আল্লাফাতুল কুলুব (চিত্ত জয় করার জন্য)- নতুন মুসলিম যার ঈমান এখনো পরিপক্ক হয়নি অথবা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অমুসলিম। যাদের চিত্ত (দ্বীন ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করে) আকর্ষণ ও উৎসাহিত করণ আবশ্যকীয় মনে করে যাকাত দান করা হয়, যাতে তাদের ঈমান পরিপক্ক হয়। এ খাতের আওতায় দুঃস্থ নওমুসলিম ব্যক্তিদের যাকাত প্রদানের ব্যাপারে ফকিহরা অভিমত প্রদান করেছেন।

পঞ্চম খাত : ক্রীতদাস/বন্দী মুক্তি- এ খাতে ক্রীতদাস-দাসী/বন্দী মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। অন্যায়ভাবে কোনো নিঃস্ব ও অসহায় ব্যক্তি বন্দী হলে তাকেও মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। বর্তমান সময়ে ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় এই খাতটি আর বিবেচ্য নয়। 

ষষ্ঠ খাত : ঋণগ্রস্থ- এ ধরনের ব্যক্তিকে তার ঋণ মুক্তির জন্য যাকাত দেয়ার শর্ত হচ্ছে- সেই ঋণগ্রস্থের কাছে ঋণ পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ না থাকা। আবার কোনো ইমাম এ শর্তারোপও করেছেন যে, সে ঋণ যেন কোনো অবৈধ কাজের জন্য- যেমন মদ কিংবা নাজায়েয প্রথা অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য ব্যয় না করে।

সপ্তম খাত : আল্লাহর পথে- সম্বলহীন মুজাহিদের যুদ্ধাস্ত্র/সরঞ্জাম উপকরণ সংগ্রহ এবং নিঃস্ব ও অসহায় গরীব দ্বীনি শিক্ষারত শিক্ষার্থীকে এ খাত থেকে যাকাত প্রদান করা যাবে। এ ছাড়াও ইসলামের মাহাত্ম ও গৌরব প্রচার ও প্রসারের কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে যারা জীবিকা অর্জনের এবং যে আলিমগণ দ্বীনি শিক্ষাদানের কাজে ব্যাপৃত থাকায় জীবিকা অর্জনের অবসর পান না। তারা অসচ্ছল হলে সর্বসম্মতভাবে তাদেরকেও যাকাত দেয়া যাবে।

অষ্টম খাত : অসহায় মুসাফির- যে সমস্ত মুসাফির অর্থ কষ্টে নিপতিত তাদেরকে মৌলিক প্রয়োজন পুরণ হওয়ার মতো এবং বাড়ী ফিরে আসতে পারে এমন পরিমাণ অর্থ যাকাত থেকে প্রদান করা যায়।



জাকাত আদায় না করার পরিণতি :

০১. যাকাত না দেয়া প্রতিটি সম্পদের একটি আকৃতি হবে। যা আগুনে উত্তপ্ত করে ব্যক্তির শরীরে দাগিয়ে দেয়া হবে।

০২. কোনো কোনো সম্পদ বিষাক্ত সাপে পরিণত হবে এবং যাকাত আদায়কারীকে দংশন করতে থাকবে।

০৩. প্রাণী জাতীয় সম্পদসমূহ কোনটা শিং দিয়ে আঘাত করবে আবার কোনটা দাঁত দিয়ে কামড় দেবে।



যাকাত আদায়ের বিবিধ উপকারিতা ও শিক্ষা :

০১. গরীবের প্রযোজন পূর্ণ হয়।

০২. অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন হয়।

০৩. সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতাকে শেষ করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।

০৪. মুসলমানদের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

০৫. দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

০৬. চুরি-ডাকাতি-চিনতাইসহ সবরকম অভাবজনিত অপরাধ মূলোৎটাটিত হয়।

০৭. গরীব-ধনীর মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়।

০৮. সম্পদের বরকত ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যাকাতের সম্পদ কমে না। (সহিহ মুসলিম- হা : ৬৭৫৭, মা :, শা :, হা: ৬৯/২৫৮৮, জামি আত তিরমিযী-হা : ২০২৯, সহিহ)। অর্থাৎ- হয়তো দৃশ্যত: সম্পদের পরিমাণ কমবে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এই স্বল্প সম্পদের মাঝেই বেশি সম্পদের কার্যকারী ক্ষমতা দিয়ে দেবেন।

০৯. সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি পায়। কেননা সম্পদ যখন যাকাতের মাধ্যমে অভাবীদের মাঝে বন্টিত হয়, তখন এর উপকারিতার পরিধি বিস্তত হয়। আর যখন তা ধনীর পকেটে কুক্ষিগত থাকে, তখন এর উপকারিতার পরিধিও সংকীর্ণ হয়।

১০. যাকাত প্রদানকারী দান ও দয়ার গুণে গুণান্বিত হয়।

১১. অন্তরে অভাবীর প্রতি মায়া-মমতা সৃষ্টি হয়।

১২. কৃপণতার ন্যায় অসৎ গুণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা যায়। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করো; যেন তুমি সেগুলোকে এর মাধ্যমে পবিত্র ও বরকতময় করতে পার।’ (সূরা : আত তাওবাহ, আয়াত : ১০৩)।
Thanks for reading this post. For any quary contact with us by WhatsApp https://chat.whatsapp.com/Fx5E2Otzhqn4nIBXRXpsFk

কালেমা


কালেমা বা কালিমা পরিচিতি

(আরবি: ٱلكَلِمَات‎‎) ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সংবলিত কয়েকটি আরবি পংক্তির নাম। এর মাধ্যমেই ইসলামের প্রথম স্তম্ভ শাহাদাহ্‌ পূর্ণতা পায়। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ — আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ বা উপাস্য নেই। এটি ইসলামের চূড়ান্ত কালেমা, মানবজীবনের পরম বাক্য। এই মহামূল্যবান বাণীর রয়েছে বিশেষ মর্যাদা এবং এর সাথে সম্পর্ক রয়েছে বিভিন্ন হুকুম আহকামের। আর এই কালেমার রয়েছে এক বিশেষ অর্থ ও উদ্দেশ্য এবং কয়েকটি শর্ত, ফলে এ কালেমাকে গতানুগতিক মুখে উচ্চারণ করাই ঈমানের জন্য যথেষ্ট নয়। বান্দার প্রথম কাজ হলো এ কালেমার স্বীকৃতি দান করা; কেননা এ হলো সমস্ত কর্মের মূল ভিত্তি। ইসলামে মোট ছয়টি কালেমা রয়েছে।



ব্যক্তি জীবনে কালেমার গুরুত্ব

এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বাণী যা মুসলিমগণ তাদের আযান, ইকামত, বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলিষ্ঠ কন্ঠে ঘোষণা করে থাকে, এটি এমন এক কালেমা যার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আসমান জমিন, সৃষ্টি হয়েছে সমস্ত মাখলুকাত। আর এর প্রচারের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসুল এবং অবতীর্ণ করেছেন আসমানী কিতাবসমূহ, প্রণয়ন করেছেন অসংখ্য বিধান। প্রতিষ্ঠিত করেঁছেন মীযান এবং ব্যবস্থা করেছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেবের, তৈরি করেছেন জান্নাত এবং জাহান্নাম। এই কালেমাকে স্বীকার করা এবং অস্বীকার করার মাধ্যমে মানব সম্প্রদায় ঈমানদার এবং কাফির এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। অতএব, সৃষ্টি জগতে মানুষের কর্ম, কর্মের ফলাফল, পুরস্কার অথবা শাস্তি সব কিছুরই উৎস হচ্ছে এই কালেমা। এরই জন্য উৎপত্তি হয়েছে সৃষ্টিকুলের, এ সত্যের ভিত্তিতেই আখিরাতে জিজ্ঞাসাবাদ এবং এর ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হবে সাওয়াব ও শাস্তি। এই কালেমার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুসলিমদের কিবলা এবং এ হলো মুসলিমদের জাতি সত্তার ভিত্তি-প্রস্তর এবং এর প্রতিষ্ঠার জন্য খাপ থেকে খোলা হয়েছে জিহাদের তরবারী।

বান্দার ওপর এটাই হচ্ছে আল্লাহর অধিকার, এটাই ইসলামের মূল বক্তব্য ও শান্তির আবাসের (জান্নাতের) চাবিকাঠি এবং পূর্বা-পর সকলেই জিজ্ঞাসিত হবে এই কালেমা সম্পর্কে। আর এ কালেমাই হচ্ছে কুফর ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী।



কালেমার উদ্দেশ্য

কালেমা যার সাক্ষ্য আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং নিজেই নিজের জন্য দিয়েছেন, আরো দিয়েছেন ফিরিশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণ।



 আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

আল্লাহ্‌ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ্‌ নেই। আর ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও; আল্লাহ্‌ ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, (তিনি) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।



এ কালেমাই ইখলাস তথা সত্যনিষ্ঠার বাণী, এটাই সত্যের সাক্ষ্য ও তার দাওয়াত এবং শির্ক এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বাণী এবং এ জন্যই সমস্ত সৃষ্টি জগতের সৃষ্টি।



আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।



এই কালেমা প্রচারের জন্য আল্লাহ সমস্ত রাসূল এবং আসমানি কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছেন, তিনি বলেন,



আমরা তোমার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তাঁর নিকট এই প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি যে, আমি ছাড়া অন্য কোনো সত্য উপাস্য নেই, অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর।



আল্লাহ আরো বলেন,

তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশে ওহী (প্রত্যাদেশ) সহ ফিরিশতা অবতীর্ণ করেন, এই মর্মে সতর্ক করবার জন্য যে, আমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয়ভক্তি কর।



ইবন উইয়াইনা বলেন, “বান্দার ওপর আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে প্রধান এবং বড় নি‘আমত হলো তিনি তাদেরকে لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাঁর এই একত্ববাদের সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন। দুনিয়ার পিপাসা কাতর তৃষ্ণার্ত একজন মানুষের নিকট ঠাণ্ডা পানির যে মূল্য, আখেরাতে জান্নাতবাসীদের জন্য এ কালেমা তদ্রূপ’



স্তম্ভ ও শর্তসমূহ

إِلهَ (ইলাহ) শব্দের অর্থ ‘মা‘বুদ’ আর তিনি হচ্ছেন ঐ সত্ত্বা যে সত্ত্বার প্রতি কল্যাণের আশায় এবং অকল্যান থেকে বাঁচার জন্য হৃদয়ের আসক্তি সৃষ্টি হয় এবং মন তার উপাসনা করে।

এ কালেমার রয়েছে দু’টি স্তম্ভ বা রুকন। তন্মধ্যে প্রথম রুকন হচ্ছে না বাচক আর অপরটি হলো হাঁ বাচক।



না বাচক কথাটির অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত সমস্ত কিছুর ইবাদতকে অস্বীকার করা, আর হ্যাঁ সূচক কথাটির অর্থ হচ্ছে একমাত্র আল্লাহই সত্য মা‘বুদ। আর মুশরিকগণ আল্লাহ ব্যতীত যেসব মা‘বুদের উপাসনা করে সবগুলো মিথ্যা এবং বানোয়াট মা‘বুদ। 



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

এটা এ জন্য যে, আল্লাহ-ই প্রকৃত সত্য, আর তিনি ব্যতীত যাদেরকে তারা ডাকে সে সব কিছুই বাতিল।



এই পবিত্র কালেমা মুখে বলাতে কোনই উপকারে আসবে না যে পর্যন্ত এর সাতটি (কোনো কোনো আলেম এর সাথে অষ্টম শর্ত যোগ করেছেন, আর তা হচ্ছে, তাগুতের সাথে কুফুরী।) শর্ত পূর্ণ করা না হবে।

প্রথম শর্ত: এ কালেমার না বাচক এবং হ্যাঁ বাচক দু’টি অংশের অর্থ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। অর্থ এবং উদ্দেশ্য না বুঝে শুধুমাত্র মুখে এ কালেমা উচ্চারণ করার মধ্যে কোনো লাভ নেই। কেননা সে ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি এ কালেমার মর্মের ওপর ঈমান আনতে পারবে না। আর তখন এ ব্যক্তির উদাহরণ হবে ঐ লোকের মতো যে লোক এমন এক অপরিচিত ভাষায় কথা বলা শুরু করল যে ভাষা সম্পর্কে তার সামান্যতম জ্ঞান ও নেই।

দ্বিতীয় শর্ত: ইয়াকীন বা দৃঢ় প্রত্যয়। অর্থাৎ এ কালেমার মাধ্যমে যে কথার স্বীকৃতি দান করা হলো তাতে সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করা চলবে না।

তৃতীয় শর্ত: ঐ ইখলাস বা নিষ্ঠা, যা لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর দাবী অনুযায়ী ঐ ব্যক্তিকে শির্ক থেকে মুক্ত রাখবে।

চতুর্থ শর্ত: এই কালেমা পাঠকারীকে সত্যের পরাকাষ্ঠা হতে হবে, যে সত্য তাকে মুনাফিকী আচরণ থেকে বিরত রাখবে। মুনাফিকরাও لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এ কালেমা মুখে মুখে উচ্চারণ করে থাকে, কিন্তু এর নিগূঢ় তত্ত্ব ও প্রকৃত অর্থে তারা বিশ্বাসী নয়।

পঞ্চম শর্ত: ভালোবাসা। অর্থাৎ মুনাফেকী আচরণ বাদ দিয়ে এই কালেমাকে সানন্দচিত্তে গ্রহণ করতে হবে ও ভালোবাসতে হবে।

ষষ্ট শর্ত: আনুগত্য করা। এই কালেমার দাবী অনুযায়ী তার হকগুলো আদায় করা, আর তা হচ্ছে আল্লাহর জন্য নিষ্ঠা ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ফরয ওয়াজিব কাজগুলো সম্পাদন করা।

সপ্তম শর্ত: আন্তরিকভাবে এ কালেমাকে কবুল করা এবং এর পর দ্বীনের কোনো কাজকে প্রত্যাখান করা থেকে নিজকে বিরত রাখা[৭]। অর্থাৎ আল্লাহর যাবতীয় আদেশ পালন করতে হবে এবং তাঁর নিষিদ্ধ সব কাজ পরিহার করতে হবে।

এই শর্তগুলো প্রখ্যাত আলেমগণ চয়ন করেছেন কুরআন ও হাদীসের আলোকেই। অতএব, এ কালেমাকে শুধুমাত্র মুখে উচ্চারণ করলেই যথেষ্ট এমন ধারণা ঠিক নয়।



কালেমার অর্থ ও তার দাবি

لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর অর্থ হচ্ছে, সত্য এবং হক উপাস্য বলতে যে ইলাহকে বুঝায় তিনি হলেন একমাত্র আল্লাহ, যার কোনো শরীক নেই এবং তিনিই একমাত্র ইবাদত পাওয়ার অধিকারী। তাই এ মহান কালেমার অর্থে এটাও অন্তর্ভুক্ত যে, তিনি ব্যতীত যত উপাস্য আছে সব অসত্য এবং বাতিল, তাই তারা ইবাদত পাওয়ার অযোগ্য। এজন্য অধিকাংশ সময় আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাতের আদেশের সাথে সাথে কুরআনে তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করতে নিষেধ করা সম্বলিত নির্দেশনা এসেছে। কেননা আল্লাহর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা হলে সে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না। 



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

আর তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করো না।



তিনি আরো বলেন,

আর নিশ্চয় আমরা প্রত্যেক জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি এ বলে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর।



ইবন রজব বলেন, কালেমার এই অর্থ বাস্তবায়িত হবে তখন, যখন বান্দাহ لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর স্বীকৃতি দান করার পর এটা বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মা‘বুদ হওয়ার একমাত্র যোগ্য ঐ সত্তা যাকে ভয়-ভীতি, বিনয়, ভালোবাসা, আশা-ভরসা সহকারে আনুগত্য করা হয়, যার নিকট প্রার্থনা করা হয়, যার সমীপে দো‘আ করা হয় এবং যার অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা হয়। আর এ সমস্ত কাজ একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য প্রযোজ্য নয়। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কার কাফেরদেরকে বললেন, তোমরা বলো, لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ উত্তরে তারা বললো,

সে কি সমস্ত ইলাহকে এক ইলাহতে পরিণত করেছে ? এ তো অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়।



তাদের সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন,

তাদেরকে যখন বলা হতো, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই’ তখন তারা উদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের সকল উপাস্যকে পরিত্যাগ করব?



যে ব্যক্তি কালেমার অর্থ জেনে বুঝে কালেমার দাবী অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যমে এর স্বীকৃতি দান করল এবং প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় নিজকে শির্ক থেকে বিরত রেখে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতকে নির্ধারণ করল, সে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে মুসলিম। আর যে এই কালেমার মর্মার্থকে বিশ্বাস না করে এমনিতে প্রকাশ্যভাবে এর স্বীকৃতি দান করল এবং এর দাবী অনুযায়ী গতানুগতিকভাবে কাজ করল সে ব্যক্তি মূলত মুনাফিক। আর যে মুখে এ কালেমা বলল এবং শির্ক এর মাধ্যমে এর বিপরীত কাজ করল সে প্রকৃত অর্থে স্ববিরোধী মুশরিক। সুতরাং এ কালেমা উচ্চারণের সাথে সাথে অবশ্যই এর অর্থ জানতে হবে। কারণ, অর্থ জানাই হচ্ছে এর দাবী অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যম। 



আল্লাহ বলেন,

আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে তারা ডাকে তারা সুপারিশের অধিকারী নয়, তবে যে জ্ঞানের ভিত্তিতে সত্যের সাক্ষ্য দেয় সে ছাড়া।



আর কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অন্যতম দাবী হলো ইবাদত, মোয়‘আমেলাত (লেন-দেন) হালাল-হারাম, সর্বাবস্থায় আল্লাহর বিধানকে মেনে নেওয়া এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রবর্তিত বিধানকে বর্জন করা। 



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

তাদের কি এমন কোনো শরীক দেবতা আছে যারা তাদের জন্য বিধান রচনা করবে যার অনুমতি আল্লাহ দেন নি।



এ থেকে বুঝা গেল অবশ্যই ইবাদত, লেন-দেন এবং মানুষের মধ্যে বিতর্কিত বিষয়সমূহ ফয়সালা করতে আল্লাহর বিধানকে মেনে নিতে হবে এবং এর বিপরীত মানব রচিত সকল বিধানকে ত্যাগ করতে হবে। এ অর্থ থেকে আরো বুঝা গেল যে, সমস্ত বিদ‘আত এবং কুসংস্কার যা জিন্ন ও মানবরূপী শয়তান রচনা করে, তাও পরিত্যাগ করতে হবে। আর যে এগুলোকে গ্রহণ করবে সে মুশরিক বলে গণ্য হবে। যেমন, 



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

আল্লাহ ব্যতীত তারা তাদের পণ্ডিত ও পুরোহিতদেরকে রবরূপে গ্রহণ করেছে।



সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আদী ইবন হাতেম আত-ত্বায়ীর সামনে উল্লিখিত আয়াত পাঠ করেন তখন ‘আদী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আমাদের পীর-পুরোহিতদের ইবাদত করি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ যে সমস্ত জিনিস হারাম করেছেন তোমাদের পীর-পুরোহীতরা তা হালাল করেছে, আর আল্লাহ যে সমস্ত জিনিস হালাল করেছেন তা তারা হারাম বা অবৈধ করেছে, তোমরা কি এতে তাদের অনুসরণ কর না? আদী বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ, এতে আমরা তাদের অনুসরণ করতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটাই তাদের ইবাদত।

আশ-শাইখ আবদুর রহমান ইবন হাসান বলেন, সুতরাং অন্যায় কাজে তাদের আনুগত্য করার জন্যই এটা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের ইবাদত হয়ে গেল এবং এরই মাধ্যমে পীর-পুরোহিতদের তারা নিজেদের রব হিসেবে গ্রহণ করল। আর এ হলো আমাদের বর্তমান জাতির অবস্থা এবং এটা এক প্রকার বড় শির্ক যার মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদকে অস্বীকার করা হয়, যে একত্ববাদ বা তাওহীদের অর্থ বহন করে কালেমা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ এর সাক্ষ্য। অতএব, এখানে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, এই ইখলাসের কালেমা (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ) এসব বিষয়কে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে কারণ তা এ কালেমার অর্থের সম্পূর্ণ বিরোধী।



অনুরূভাবে মানব রচিত আইনের কাছে বিচার চাওয়া, বিচারের জন্য সেগুলোর দ্বারস্থ হওয়া পরিত্যাগ করা ওয়াজিব। কেননা, বিচার ফয়সালাতে আল্লাহর কিতাব কুরআনের কাছে যাওয়া ওয়াজিব। তদ্রূপ আল্লাহর কিতাব ব্যতীত অন্য কোনো আইন ও বিধানের কাছে বিচারের জন্য যাওয়া পরিত্যাগ করাও ওয়াজিব। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক ফয়সালা করে না তার বিষয়ে আল্লাহর ফয়সালা হলো এই যে, সে কাফির অথবা যালিম অথবা ফাসেক এবং তার ঈমানদার থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। যা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী যে ব্যক্তি ফয়সালা করবে না সে কাফির হয়ে যাবে যখন সে শরী‘আত বিরোধী ফায়সালা দেয়াকে জায়েয বা মুবাহ মনে করবে অথবা মনে করবে যে, তার ফয়সালা আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালা থেকে অধিক উত্তম বা অধিক গ্রহণীয়। এমন বিশ্বাস পোষণ করা হবে তাওহীদ পরিপন্থী, কুফুরী ও শির্ক এবং তা لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এই কালেমার অর্থের একেবারে বিরোধী।



আর যদি বিচারক বা শাসক শরী‘আত বিরোধী ফয়সালা দানকে মুবাহ বা জায়েয মনে না করে, বরং শরী‘আত অনুযায়ী ফয়সালা প্রদানকে ওয়াজিব মনে করে কিন্তু পার্থিব লালসার বশবর্তী হয়ে নিজের মনগড়া আইন দিয়ে ফয়সালা করে তবে এটা ছোট শির্ক ও ছোট কুফুরীর পর্যায়ে পড়বে। তবে এটাও لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর অর্থের পরিপন্থী। অতএব, لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ একটি পূর্ণাঙ্গ পথ ও পদ্ধতি, এ কালেমাই মুসলিমদের জীবনকে সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং পরিচালনা করবে তাদের সমস্ত ইবাদত-বন্দেগী এবং সমস্ত কাজ কর্মকে। এই কালেমা শুধুমাত্র কতগুলো শব্দের সমারোহ নয় যে, না বুঝে একে সকাল সন্ধ্যার তাসবীহ হিসেবে শুধুমাত্র বরকতের জন্য পাঠ করবে আর এর দাবী অনুযায়ী কাজ করা থেকে বিরত থাকবে অথবা এর নির্দেশিত পথে চলবে না। মূলতঃ অনেকেই একে শুধুমাত্র গতানুগতিক ভাবে মুখে উচ্চারণ করে থাকে, কিন্তু তাদের বিশ্বাস ও কর্ম এর পরিপন্থী।



প্রথম কালেমা

ইসলামের প্রথম কালেমা হচ্ছে কালেমায়ে তাইয়্যেবা এর অর্থ হল পবিত্র বাক্য। 



আরবি

لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ ٱللَّٰهِ


প্রতিবর্ণীকরণ / বাংলা উচ্চারণ

লা~ইলা-হা ইল্লাল্ল-হু মুহাম্মাদুর রসূলুল্ল-হ্‌।



বাংলা অনুবাদ

আল্লাহ্ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নাই, মুহাম্মাদ (সাঃ) তার প্রেরিত রসূল।



দ্বিতীয় কালেমা

ইসলামের দ্বিতীয় কালেমা হচ্ছে কালেমায়ে শাহাদাত, যার অর্থ হল সাক্ষ্য বাক্য।



আরবি

 أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ‎



প্রতিবর্ণীকরণ / বাংলা উচ্চারণ

আশ্‌হাদু আল-লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্‌দাহু-লা-শারীকালাহু ওয়া আশ্‌হাদু আন্না মুহাম্মাদান আ'বদুহু ওয়া রাসূলুহু।



বাংলা অনুবাদ

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তার বান্দা ও প্রেরিত রাসুল।



তৃতীয় কালেমা

ইসলামের তৃতীয় কালেমা হচ্ছে কালেমায়ে তামজিদ, যার অর্থ হল "শ্রেষ্ঠত্ববাদী বাক্য"। 



আরবি

 سُبْحَانَ ٱللَّٰهِ وَٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ وَلَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَٱللَّٰهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِٱللَّٰهِ ٱلْعَلِيِّ ٱلْعَظِيمِ‎



বাংলা উচ্চারণ

সুবহানআল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলীইল আজিম।



বাংলা অনুবাদ

মহিমান্বিত আল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আল্লাহ‌ ছাড়া কোন মাবুদ নাই। আল্লাহ মহান। সমস্ত পবিত্রতা আল্লাহর, সকল প্রশংসা আল্লাহর। আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নাই, কোনো ক্ষমতা নাই, তিনি সম্মানিত, তিনি মহান।



চতুর্থ কালেমা

ইসলামের চতুর্থ কালেমা হচ্ছে কালেমায়ে তাওহিদ, যার অর্থ হল "একত্ববাদী বাক্য"। 



আরবি 

لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ ٱلْمُلْكُ وَلَهُ ٱلْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ حَيٌّ لَا يَمُوتُ أَبَدًا أَبَدًا، ذُو ٱلْجَلَالِ وَٱلْإِكْرَامِ بِيَدِهِ ٱلْخَيْرُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ‎



প্রতিবর্ণীকরণ / বাংলা উচ্চারণ

সম্পাদনা

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওলাহুল হামদু উহয়ী ওয়া ইয়োমিতু ওয়া হুয়া হাইয়ুল লা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা জুল জালালি ওয়াল ইকরাম বি ইয়াদিহিল খাইর ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির



বাংলা অনুবাদ

আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তার কোন অংশীদার নেই। সকল ক্ষমতা এবং প্রশংসা তারই জন্য। তিনিই জীবন ও মৃত্যুর মালিক। তিনি চিরঞ্জীব, তিনি সকল সম্মানের মালিক। তার হাতেই সকল মঙ্গল এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন।



পঞ্চম কালেমা 

ইসলামের পঞ্চম কালেমা - কালেমা-ই-আস্তাগফের নামে পরিচিত। 



আরবি 

أَسْتَغْفِرُ ٱللَّٰهَ رَبِّي مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ أَذْنَبْتُهُ عَمْدًا أَوْ خَطَأً سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَأَتُوبُ إِلَيْهِ مِنَ ٱلذَّنْبِ ٱلَّذِي أَعْلَمُ وَمِنَ ٱلذَّنْبِ ٱلَّذِي لَا أَعْلَمُ، إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ ٱلْغُيُوبِ وَسَتَّارُ ٱلْعُيُوْبِ وَغَفَّارُ ٱلذُّنُوبِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِٱللَّٰهِ ٱلْعَلِيِّ ٱلْعَظِيمِ‎



প্রতিবর্ণীকরণ / বাংলা উচ্চারণ

আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জামবি আয নাবতুহু আমাদান আওখাতাআন সিররান আওয়ালা নিয়াতান ওয়াতুবু ইলাইহি মিনাযযামবিল্লাজি ওয়ামিনাযযামবিল্লাজি লা আলামু ইন্নাকা আনতা আল্লামুল গুয়ুবী ওয়া সাত্তারুল উইয়ুবী ওয়া গাফফারুজজুনুবি ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিউল আযীম।



বাংলা অনুবাদ

আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই সকল পাপ থেকে, যা আমি সংঘটিত করেছি আমার জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে, গোপনে বা প্রকাশ্যে এবং আমি আমার পালনকর্তার আশ্রয় চাই সেই পাপ থেকে, যে পাপ আমি জানি এবং যে পাপ আমি জানিনা। অবশ্যই আপনি লুকানো এবং গোপন (ভুল) পাপ সম্পর্কে জানেন এবং ক্ষমাশীল। আল্লাহ ছাড়া কোন শক্তি নেই, কোন ক্ষমতা নেই, তিনি সম্মানিত, তিনি মহান।



ষষ্ঠ কালেমা

ইসলামের ষষ্ঠ কালেমা হচ্ছে কালেমা-ই-রুদ-ই-কুফর ইসলামে অবিশ্বাসীদের প্রত্যাখ্যানমূলক বাক্য হিসেবেও পরিচিত।



আরবি

ٱللَّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْءً وَأَنَا أَعْلَمُ بِهِ وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ بِهِ تُبْتُ عَنْهُ وَتَبَرَّأَتُ مِنَ ٱلْكُفْرِ وَٱلشِّرْكِ وَٱلْكِذْبِ وَٱلْغِيبَةِ وَٱلْبِدْعَةِ وَٱلنَّمِيمَةِ وَٱلْفَوَاحِشِ وَٱلْبُهْتَانِ وَٱلْمَعَاصِي كُلِّهَا وَأَسْلَمْتُ وَأَقُولُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ ٱللَّٰهِ‎



প্রতিবর্ণীকরণ / বাংলা উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন উশরিকা বিকা শাইআও ওয়ানা আলামু বিহি ওয়াস্তাগফিরুকা লিমালা আলামু বিহি তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল-কুফরি ওয়াশ-শিরকী ওয়াল-কিজবি ওয়ালা-গিবাতি ওয়াল-বিদাতি ওয়ান্না-মিমাতি ওয়াল-ফাওয়া হিমি ওয়াল-রুহতানী ওয়াল-মাআসি কুল্লিহা ওয়াসলামতু ওয়াকুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।



বাংলা অনুবাদ

হে আল্লাহ নিশ্চয়, ক্ষমা চাই শিরক করা থেকে (আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা), আমি ক্ষমা চাই সকল পাপ থেকে যা সম্পর্কে আমি সচেতন নই বা জানি না, আমি পুনরায় ঘোষণা করছি, আমি সকল প্রকার কুফর থেকে, শিরক থেকে, মিথ্যা (কথা বলা), গিবত (কারও অনুপস্থিতিতে পরনিন্দা), বিদাত, পরনিন্দা, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য সকল পাপ থেকে মুক্ত। আমি ইসলাম স্বীকার এবং বিশ্বাস করি এবং ঘোষণা দিচ্ছি যে, আল্লাহ‌ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।



প্রিয় পাঠক, আপনিও অংশ নিতে পারেন আমাদের এ আয়োজনে। আপনার লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ruhulsarkaar@gmail.com ঠিকানায়।
Thanks for reading this post. For any quary contact with us by WhatsApp https://chat.whatsapp.com/Fx5E2Otzhqn4nIBXRXpsFk

সুরা ইখলাস বাংলা উচ্চারণ অর্থসহ | Surah Ikhlach with bangla meaning


স্রষ্টার একত্ববাদের ঘোষণা বা একনিষ্ঠতা (Arabic: الْإِخْلَاص, আল-ইখলাস ) বা একত্ববাদ (আরবি: التوحيد‎‎, আত-তাওহীদ), যা সাধারণত সূরা আল-ইখলাস নামে পরিচিত, হলো কুরআনের ১১২ তম অনুচ্ছেদ (সূরা)। কুরআন শরীফের ১১২তম সূরা ইখলাস। 



অবতরণের পটভূমি

মুশরিকরা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) - কে আল্লাহ্‌ তা'আলার বংশ পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল , যার উত্তরে এই সূরা নাযিল হয়। অন্য এক বিবরণে আছে যে , মদীনার ইহুদিরা এ প্রশ্ন করেছিল। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে যে , তারা আরও প্রশ্ন করেছিল- "আল্লাহ্‌ তা'আলা কিসের তৈরি ? স্বর্ণ-রৌপ্য নাকি অন্য কিছুর?" এর জওয়াবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে



সুরা ইখলাস আরবি-বাংলা উচ্চারণ-অর্থসহ

بِسۡمِ اِ۬للَّهِ اِ۬لرَّحۡمَٰنِ اِ۬لرَّحِيمِ‎

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

قُلۡ هُوَ ا۬للَّهُ اَحَدٌ ۝‎ - ১ ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ্ -১ বলুন ( হে নবি ), তিনি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। 

اَ۬للَّهُ اَ۬لصَّمَدُ ۝‎ - ২ আল্লাহুস্ সামাদ্ - ২ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। 

لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ ۝‎ - ৩ লাম্ ইয়ালিদ্ ওয়ালাম্ ইউলাদ্ - ৩ তিনি কাউকে জন্ম দেননি ; কেউ তাঁকে জন্ম দেননি।

وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُؤًا اَحَدٌۢ ۝‎ - ৪ ওয়ালাম্ ইয়াকুল্লাহু কুফুআন আহাদ - ৪ আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই ।



ব্যাখ্যা

মূল নিবন্ধসমূহ হচ্ছে শিরক ও ইসলামের দৃষ্টিতে একত্ত্ববাদ। ইসলামের প্রারম্ভিক বছরগুলোতে কুরআনের কিছু সূরা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, কখনও কখনও অঞ্চল অনুসারে বিভিন্ন সূরা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। এই সূরাটি সেগুলোর মধ্যে একটি। সূরাটি তাওহীদের একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা, আল্লাহর একত্ববাদ সমন্বিত চারটি আয়াত। আল-ইখলাস অর্থ "বিশুদ্ধতা" বা "একনিষ্ঠতা"।



এটি মক্কায় নাকি মদিনায় অবতীর্ণ তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।তবে সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হওয়ার তথ্যই সম্ভাব্য এবং যুক্তিযুক্ত, বিশেষত যেহেতু এটি আবিসিনিয়ার বিলাল দ্বারা প্রমাণিত হয়, যিনি তাঁর নিষ্ঠুর কর্তা দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিলেন এবং "আহাদ, আহাদ!" (আল্লাহ) একক, একক! বারবার বলছিলেন। উবাই ইবনে কা’ব হতে বর্ণিত যে, সূরাটি অবতীর্ণ হয় মুশরিকদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: "হে মুহাম্মাদ! তোমার প্রতিপালকের বংশপরিচয় আমাদেরকে বল।"



"তাফসির ইবনে কাসির" এ বলা হয়েছে,

যখন ইহুদিরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়েরকে উপাসনা করি’ এবং খ্রিস্টানরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র মাসীহ (ঈসা) এর উপাসনা করি’ এবং জুরোস্ত্রীরা বলে, ‘আমরা সূর্য ও চাঁদের উপাসনা করি’ এবং মুশরিকরা বলে ‘আমরা মূর্তিপূজা করি,' আল্লাহ তার রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, "বলুনঃ তিনিই আল্লাহ এক। তিনিই এক, একক, তার কোন সমকক্ষ নেই, কোন সহকারী নেই, প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, সমান এবং তার তুলনাও নেই।"

এই শব্দটি (আল-আহাদ) পরাক্রমশালী আল্লাহ ছাড়া আর কারও পক্ষে ব্যবহার করা যাবে না, কারণ তিনি (আল্লাহ) তার সমস্ত গুণাবলীতে ও কর্মে নিখুঁত।
Thanks for reading this post. For any quary contact with us by WhatsApp https://chat.whatsapp.com/Fx5E2Otzhqn4nIBXRXpsFk

সূরা আল-ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ অর্থসহ | Surah Al Fatiha


সূরা আল ফাতিহা কুরআন শরীফের ১ম সূরা। (আরবি: سورة الفاتحة) মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ আল কুরআনের প্রথম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৭ এবং রুকু সংখ্যা ১। এটি আল্লাহ্ এর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিদান স্বরূপ। সূরা ফাতিহা অন্যান্য সূরার ন্যায় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দিয়ে শুরু হয়েছে। আল ফাতিহা সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে বিধায় মক্কী সূরা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ। সূরা ফাতিহাকে ভেঙে ভেঙে পড়া যায় না বলে একে অখণ্ড সূরা নামেও ডাকা হয়। সূরা ফাতিহাকে ভেঙে পড়ার বিধান নেই।

অর্থসহ আয়াতঃ

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ    

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।

ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ رَبِّ ٱلْعَالَمِينَ ۝‎ ( ١ )  

আলহামদুলিল্লা-হি রাব্বিল আ-লামীন।

১। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে।

ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝‎ ( ٢ )  

আর রাহমা-নির রাহীম।

২। অনন্ত দয়াময়, অতীব দয়ালু।

مَالِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ ۝‎ ( ٣ )  

মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন।

৩। প্রতিফল দিবসের মালিক।

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ۝‎ ( ٤ )  

ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কানাছতা’ঈন।

৪। আমরা শুধু আপনারই দাসত্ব করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য কামনা করি।

ٱهْدِنَا ٱلصِّرَاطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ ۝‎ ( ٥ )

 ইহদিনাসসিরা-তাল মুছতাকীম।

৫। আমাদের সরল পথনির্দেশ দান করুন।

صِرَاطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ۝‎ ( ٦ )  

সিরা-তাল্লাযীনা আন’আম তা’আলাইহিম।

৬। তাদের পথে, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন।

غَيۡرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيۡهِمۡ وَلَا اَ۬لضَّآلِّينَ ۝‎ ( ٧ )  

গাইরিল মাগদূ বি’আলাইহীম ওয়ালাদ্দাল্লীন। 

৭। এবং তাদের পথে নয় যারা আপনার ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট । 



নামকরণঃ

ফাতিহা শব্দটি আরবি "ফাতহুন" শব্দজাত যার অর্থ "উন্মুক্তকরণ"। এ সূরার বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এর এই নামকরণ করা হয়েছে। যার সাহায্যে কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা হয় তাকে 'ফাতিহা' বলা হয়। অন্য কথায় বলা যায়, এ শব্দটি ভূমিকা এবং বক্তব্য শুরু করার অর্থ প্রকাশ করে।

হাদিসে এ সুরার আরও চারটি নাম পাওয়া যায় যার একটি হলো উম্মুল। তবে ইসলামী লেখালিখিতে এ সুরার অন্ততঃ ২৩ অভিধা রয়েছে। একে সাবআ মাসানী বা বহুল পঠিত সাত আয়াত বলা হয়। এই সূরাটির অন্য কয়েকটি নাম রয়েছে। যেমন- ফাতিহাতুল কিতাব, উম্মুল কিতাব, সূরাতুল-হামদ, সূরাতুস-সালাত, আস্সাব্'য়ুল মাসানী।



অবতীর্ণ হওয়ার সময়কালঃ 

এটি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের একেবারেই প্রথম যুগের সূরা। হাদীসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটিই মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ওপর নাযিলকৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সূরা। এর আগে মাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াত নাযিল হয়েছিল। সেগুলো সূরা 'আলাক্ব', 'মুয্যাম্মিল' ও 'মুদ্দাস্সির' ইত্যাদিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার ইবাদত বন্দেগী করার তৌফিক দান করুন।
Thanks for reading this post. For any quary contact with us by WhatsApp https://chat.whatsapp.com/Fx5E2Otzhqn4nIBXRXpsFk

মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পরিচয় | The identity of Allah, the Creator of the universe


আল্লাহর পরিচয়

আরবি ভাষায় মুসলিমদের উপাস্যের নাম আল্লাহ (আরবি: الله) এটি ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহে সৃষ্টিকর্তা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষায়, শব্দটি সাধারণত ইসলাম ধর্মে স্রষ্টাকে বুঝায়। "আল্লাহ" শব্দটি "আল" ও "ইলাহ" এর সংক্ষিপ্ত রূপের সমন্বয়ে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়। এটি ভাষাগতভাবে হিব্রু এবং আরামীয় ভাষায় ঈশ্বরের প্রতিশব্দ "এল" (এলোহিম) ও "এলাহ" এর সাথে সম্পর্কিত।

ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে আরবের বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা "আল্লাহ" শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। সুনির্দিষ্টভাবে, "স্রষ্টা" বুঝাতে মুসলিমগণ ও আরব খ্রিস্টানগণ এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। বাহাই, মাল্টাবাসী, মিজরাহী ইহুদি এবং শিখ সম্প্রদায়ও "আল্লাহ" শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিম মালয়েশিয়ায় খ্রিস্টান ও শিখদের "আল্লাহ" শব্দটির ব্যবহার সম্প্রতি রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

আল্লাহ" শব্দের দ্বিতীয় অক্ষর লাম (ل) কয়েক ভাবে উচ্চারিত হয়। এই শব্দটির পূর্ববর্তী অক্ষরে যবর বা পেশ থাকলে 'লাম' ভাবগম্ভীর স্বরে উচ্চারিত হয়। আবার যদি পূর্ববর্তী অক্ষরে যের থাকে তাহলে 'লাম' হালকা স্বরে উচ্চারিত হয়। 

ইসলামি ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, "আল্লাহ" হলো একমাত্র প্রশংসাযোগ্য ও সর্বশক্তিমান সত্তার প্রকৃত নাম এবং তার ইচ্ছা ও আদেশসমূহের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রদর্শন ইসলামি ধর্মবিশ্বাসের মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। "তিনিই একমাত্র উপাস্য, সমগ্র মহাবিশ্বের স্রষ্টা এবং মানবজাতির বিচারক।" "তিনি এক (ٱلْوَٰحِدُ), অদ্বিতীয় (ٱلْأَحَد), পরম করুণাময় ও সর্বশক্তিমান।" বিচার দিবস পর্যন্ত কোন মানুষের চোখ আল্লাহকে দেখতে পাবে না। ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনে আল্লাহ বাস্তব সত্তা, তার গুণাবলি ও বিভিন্ন নাম, তার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক ও আরও অনেক বিষয় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল নন এবং খ্রীষ্টীয় ত্রিত্বের অংশ নন। আল্লাহর কোন পিতা-মাতা নেই এবং সন্তান নেই।



আসমাউল হুসনা বা আল্লাহর গুণবাচক নাম

আল্লাহর ৯৯টি নাম (আরবি: أسماء الله الحسنى) হলো ইসলাম ধর্ম মতে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর গুণবাচক নামের একটি তালিকা বা সংকলন। ইসলাম ধর্ম মতে বুনিয়াদি নাম বা ভিত্তি নাম একটিই। আর তা হলো আল্লাহ্, কিন্তু তার গুণবাচক নাম অনেকগুলো।

বিভিন্ন হাদীস অনুসারে আল্লাহ'র ৯৯টি নামের একটি তালিকা আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক ক্রম নেই। তাই সম্মিলিত মতৈক্যের ভিত্তিতে কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকাও নেই। তাছাড়া কুরআন এবং হাদিসের বর্ণনা অনুসারে আল্লাহ্'র সর্বমোট নামের সংখ্যা ৯৯-এর অধিক, প্রায় ৪,০০০। অধিকন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত একটা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ্ তার কিছু নাম মানবজাতির অজ্ঞাত রেখেছেন। আল্লাহর গুণবাচক ৯৯ টি নাম নিচে দেওয়া হল।

১ আরবী উচ্চারণঃ الله, বাংলা উচ্চারণঃ আল্লাহ, অর্থঃ আল্লাহ

২ আরবী উচ্চারণঃ الرحمن, বাংলা উচ্চারণঃ আর-রহ'মান, অর্থঃ পরম দয়ালু

৩ আরবী উচ্চারণঃ الرحيم, বাংলা উচ্চারণঃ আর-রহী'ম, অর্থঃ অতিশয়-মেহেরবান

৪ আরবী উচ্চারণঃ الملك, বাংলা উচ্চারণঃ আল-মালিক, অর্থঃ সর্বকর্তৃত্বময়, সর্বাধিকারি

৫ আরবী উচ্চারণঃ القدوس, বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্বুদ্দুস, অর্থঃ নিষ্কলুষ, অতি পবিত্র

৬ আরবী উচ্চারণঃ السلام, বাংলা উচ্চারণঃ আস-সালাম, অর্থঃ নিরাপত্তা-দানকারী, শান্তি-দানকারী

৭ আরবী উচ্চারণঃ المؤمن, বাংলা উচ্চারণঃ আল-মু'মিন, অর্থঃ নিরাপত্তা ও ঈমান দানকারী

৮ আরবী উচ্চারণঃ المهيمن, বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুহাইমিন, অর্থঃ পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণকারী

৯ আরবী উচ্চারণঃ العزيز, বাংলা উচ্চারণঃ আল-আ'জীজ, অর্থঃ সর্বশক্তিমান, সবচেয়ে সম্মানিত

১০ আরবী উচ্চারণঃ الجبار, বাংলা উচ্চারণঃ আল-জাব্বার, অর্থঃ দুর্নিবার, সমুচ্চ, মহিমান্বিত, পরাক্রমশালী

১১ আরবী উচ্চারণঃ المتكبر, বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুতাকাব্বিইর, অর্থঃ সর্বশ্রেষ্ঠ, গৌরবান্বিত

১২ আরবী উচ্চারণঃ الخالق, বাংলা উচ্চারণঃ আল-খ'লিক্ব, অর্থঃ সৃষ্টিকর্তা

১৩ আরবী উচ্চারণঃ البارئ, বাংলা উচ্চারণঃ আল-বারী, অর্থঃ বিবর্ধনকারী, নির্মাণকর্তা, পরিকল্পনাকারী

১৪ আরবী উচ্চারণঃ المصور, বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুছউইর, অর্থঃ আকৃতিদানকারী

১৫ আরবী উচ্চারণঃ الغفار বাংলা উচ্চারণঃ আল-গফ্ফার, অর্থঃ মহাক্ষমতাশীল

১৬ আরবী উচ্চারণঃ القهار বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্বহার অর্থঃ দমনকারী

১৭ আরবী উচ্চারণঃ الوهاب বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়াহ্হাব অর্থঃ স্থাপনকারী

১৮ আরবী উচ্চারণঃ الرزاق বাংলা উচ্চারণঃ আর-রাজ্জাক্ব অর্থঃ প্রদানকারী, জীবিকাদাতা

১৯ আরবী উচ্চারণঃ الفتاح বাংলা উচ্চারণঃ আল ফাত্তাহ অর্থঃ প্রারম্ভকারী, বিজয়দানকারী

২০ আরবী উচ্চারণঃ العليم বাংলা উচ্চারণঃ আল-আ'লীম অর্থঃ সর্বজ্ঞানী, সর্বদর্শী

২১ আরবী উচ্চারণঃ القابض বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্ববিদ্ব' অর্থঃ নিয়ন্ত্রণকারী, সরলপথ প্রদর্শনকারী

২২ আরবী উচ্চারণঃ الباسط বাংলা উচ্চারণঃ আল-বাসিত অর্থঃ প্রসারণকারী

২৩ আরবী উচ্চারণঃ الخافض বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্বফিধ' অর্থঃ (অবিশ্বাসীদের) অপমানকারী

২৪ আরবী উচ্চারণঃ الرافع বাংলা উচ্চারণঃ আর-রফীই' অর্থঃ উন্নীতকারী

২৫ আরবী উচ্চারণঃ المعز বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুই'জ্ব অর্থঃ সম্মানপ্রদানকারী

২৬ আরবী উচ্চারণঃ المذل বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুদ্বি'ল্লু অর্থঃ সম্মানহরণকারী

২৭ আরবী উচ্চারণঃ السميع বাংলা উচ্চারণঃ আস্-সামিই' অর্থঃ সর্বশ্রোতা

২৮ আরবী উচ্চারণঃ البصير বাংলা উচ্চারণঃ আল-বাছীর অর্থঃ সর্বদ্রষ্টা

২৯ আরবী উচ্চারণঃ الحكم বাংলা উচ্চারণঃ আল-হা'কাম অর্থঃ বিচারপতি

৩০ আরবী উচ্চারণঃ العدل বাংলা উচ্চারণঃ আল-আ'দল অর্থঃ নিখুঁত

৩১ আরবী উচ্চারণঃ اللطيف বাংলা উচ্চারণঃ আল-লাতীফ অর্থঃ অমায়িক, সূক্ষ্ম দক্ষতাকারী

৩২ আরবী উচ্চারণঃ الخبير বাংলা উচ্চারণঃ আল-খ'বীর অর্থঃ সম্যক অবগত

৩৩ আরবী উচ্চারণঃ الحليم বাংলা উচ্চারণঃ আল-হা'লীম অর্থঃ ধৈর্যবান, প্রশ্রয়দাতা

৩৪ আরবী উচ্চারণঃ العظيم বাংলা উচ্চারণঃ আল-আ'জীম অর্থঃ সুমহান

৩৫ আরবী উচ্চারণঃ الغفور বাংলা উচ্চারণঃ আল-গফুর অর্থঃ মার্জনাকারী

৩৬ আরবী উচ্চারণঃ الشكور বাংলা উচ্চারণঃ আশ্-শাকুর অর্থঃ সুবিবেচক

৩৭ আরবী উচ্চারণঃ العلي বাংলা উচ্চারণঃ আল-আ'লিইউ অর্থঃ মহীয়ান

৩৮ আরবী উচ্চারণঃ الكبير বাংলা উচ্চারণঃ আল-কাবিইর অর্থঃ সুমহান

৩৯ আরবী উচ্চারণঃ الحفيظ বাংলা উচ্চারণঃ আল-হা'ফীজ অর্থঃ সংরক্ষণকারী

৪০ আরবী উচ্চারণঃ المقيت বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুক্বীত অর্থঃ লালনপালনকারী

৪১ আরবী উচ্চারণঃ الحسيب বাংলা উচ্চারণঃ আল-হাসীব অর্থঃ মীমাংসাকারী

৪২ আরবী উচ্চারণঃ الجليل বাংলা উচ্চারণঃ আল-জালীল অর্থঃ গৌরবান্বিত

৪৩ আরবী উচ্চারণঃ الكريم বাংলা উচ্চারণঃ আল-কারীম অর্থঃ উদার, অকৃপণ

৪৪ আরবী উচ্চারণঃ الرقيب বাংলা উচ্চারণঃ আর-রক্বীব অর্থঃ সদা জাগ্রত, অতন্দ্র পর্যবেক্ষণকারী

৪৫ আরবী উচ্চারণঃ المجيب বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুজীব অর্থঃ সাড়া দানকারী, উত্তরদাতা

৪৬ আরবী উচ্চারণঃ الواسع বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়াসি' অর্থঃ অসীম, সর্বত্র বিরাজমান

৪৭ আরবী উচ্চারণঃ الحكيم বাংলা উচ্চারণঃ আল-হাকীম অর্থঃ সুবিজ্ঞ, সুদক্ষ

৪৮ আরবী উচ্চারণঃ الودود বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়াদুদ অর্থঃ স্নেহশীল

৪৯ আরবী উচ্চারণঃ المجيد বাংলা উচ্চারণঃ আল-মাজীদ অর্থঃ মহিমান্বিত

৫০ আরবী উচ্চারণঃ الباعث বাংলা উচ্চারণঃ আল-বাই'ছ' অর্থঃ পুনরুত্থানকারী

৫১ আরবী উচ্চারণঃ الشهيد বাংলা উচ্চারণঃ আশ্-শাহীদ অর্থঃ সাক্ষ্যদানকারী

৫২ আরবী উচ্চারণঃ الحق বাংলা উচ্চারণঃ আল-হা'ক্ব অর্থঃ প্রকৃত সত্য

৫৩ আরবী উচ্চারণঃ الوكيل বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়াকিল অর্থঃ সহায় প্রদানকারী, আস্থাভাজন, উকিল

৫৪ আরবী উচ্চারণঃ القوى বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্বউইউ অর্থঃ ক্ষমতাশালী

৫৫ আরবী উচ্চারণঃ المتين বাংলা উচ্চারণঃ আল-মাতীন অর্থঃ সুদৃঢ়, সুস্থির

৫৬ আরবী উচ্চারণঃ الولي বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়ালিইউ অর্থঃ বন্ধু, সাহায্যকারী, শুভাকাঙ্ক্ষী, অভিভাবক

৫৭ আরবী উচ্চারণঃ الحميد বাংলা উচ্চারণঃ আল-হা'মীদ অর্থঃ সকল প্রশংসার দাবীদার, প্রশংসনীয়

৫৮ আরবী উচ্চারণঃ المحصى বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুহছী অর্থঃ বর্ণনাকারী, গণনাকারী

৫৯ আরবী উচ্চারণঃ المبدئ বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুব্দি' অর্থঃ অগ্রণী, প্রথম প্রবর্তক, সৃজনকর্তা

৬০ আরবী উচ্চারণঃ المعيد বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুঈ'দ অর্থঃ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী, পুনরূদ্ধারকারি

৬১ আরবী উচ্চারণঃ المحيي বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুহ'য়ী অর্থঃ জীবনদানকারী

৬২ আরবী উচ্চারণঃ المميت বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুমীত অর্থঃ ধ্বংসকারী, মৃত্যু আনয়নকারী

৬৩ আরবী উচ্চারণঃ الحي বাংলা উচ্চারণঃ আল-হাইয়্যু অর্থঃ চিরঞ্জীব, যার কোন শেষ নাই

৬৪ আরবী উচ্চারণঃ القيوم বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্বাইয়্যুম অর্থঃ স্বয়ং স্থিতিশীল

৬৫ আরবী উচ্চারণঃ الواجد বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়াজিদ অর্থঃ পর্যবেক্ষক, আবিষ্কর্তা, চিরস্থায়ী

৬৬ আরবী উচ্চারণঃ الماجد বাংলা উচ্চারণঃ আল-মাজিদ অর্থঃ সুপ্রসিদ্ধ

৬৭ আরবী উচ্চারণঃ الواحد বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়াহি'দ অর্থঃ এক, অনন্য, অদ্বিতীয়

৬৮ আরবী উচ্চারণঃ الصمد বাংলা উচ্চারণঃ আছ্-ছমাদ অর্থঃ চিরন্তন, অবিনশ্বর, নির্বিকল্প, সুনিপুণ, স্বয়ং সম্পূর্ণ

৬৯ আরবী উচ্চারণঃ القادر বাংলা উচ্চারণঃ আল-ক্বদির অর্থঃ সর্বশক্তিমান

৭০ আরবী উচ্চারণঃ المقتدر বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুক্ব্তাদির অর্থঃ প্রভাবশালী, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী

৭১ আরবী উচ্চারণঃ المقدم বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুক্বদ্দিম অর্থঃ অগ্রগতিতে সহায়তা প্রদানকারী

৭২ আরবী উচ্চারণঃ المؤخر বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুয়াক্খির অর্থঃ বিলম্বকারী

৭৩ আরবী উচ্চারণঃ الأول বাংলা উচ্চারণঃ আল-আউয়াল অর্থঃ সর্বপ্রথম, যার কোন শুরু নাই

৭৪ আরবী উচ্চারণঃ الآخر বাংলা উচ্চারণঃ আল-আখির অর্থঃ সর্বশেষ, যার কোন শেষ নাই

৭৫ আরবী উচ্চারণঃ الظاهر বাংলা উচ্চারণঃ আজ-জ'হির অর্থঃ সুস্পষ্ট, সুপ্রতীয়মান, বাহ্য

৭৬ আরবী উচ্চারণঃ الباطن বাংলা উচ্চারণঃ আল-বাত্বিন অর্থঃ লুক্কায়িত, অস্পষ্ট, অন্তরস্থ

৭৭ আরবী উচ্চারণঃ الوالي বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়ালি অর্থঃ সুরক্ষাকারী বন্ধু, অনুগ্রহকারী, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রভু

৭৮ আরবী উচ্চারণঃ المتعال বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুতাআ'লি অর্থঃ সর্বোচ্চ মহিমান্বিত, সুউচ্চ

৭৯ আরবী উচ্চারণঃ البر বাংলা উচ্চারণঃ আল-বার্ অর্থঃ কল্যাণকারী

৮০ আরবী উচ্চারণঃ التواب বাংলা উচ্চারণঃ আত্-তাওয়াব অর্থঃ বিনম্র, সর্বদা আবর্তিতমান

৮১ আরবী উচ্চারণঃ المنتقم বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুনতাক্বিম অর্থঃ প্রতিফল প্রদানকারী

৮২ আরবী উচ্চারণঃ العفو বাংলা উচ্চারণঃ আল-আ'ফঊ অর্থঃ শাস্তি মউকুফকারী, গুনাহ ক্ষমাকারী

৮৩ আরবী উচ্চারণঃ الرؤوف বাংলা উচ্চারণঃ আর-রউফ অর্থঃ সদয়, সমবেদনা প্রকাশকারী

৮৪ আরবী উচ্চারণঃ مالك الملك বাংলা উচ্চারণঃ মালিকুল-মুলক অর্থঃ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী

৮৫ আরবী উচ্চারণঃ ذو الجلال و الإكرام বাংলা উচ্চারণঃ যুল-জালালি-ওয়াল-ইকরাম অর্থঃ মর্যাদা ও ঔদার্যের প্রভু

৮৬ আরবী উচ্চারণঃ المقسط বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুক্ব্সিত অর্থঃ ন্যায়পরায়ণ, প্রতিদানকারী

৮৭ আরবী উচ্চারণঃ الجامع বাংলা উচ্চারণঃ আল-জামিই' অর্থঃ একত্র আনয়নকারী, ঐক্য সাধনকারী

৮৮ আরবী উচ্চারণঃ الغني বাংলা উচ্চারণঃ আল-গণিই' অর্থঃ ঐশ্বর্যবান, স্বতন্ত্র

৮৯ আরবী উচ্চারণঃ المغني বাংলা উচ্চারণঃ আল-মুগনিই' অর্থঃ সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী

৯০ আরবী উচ্চারণঃ المانع বাংলা উচ্চারণঃ আল-মানিই' অর্থঃ প্রতিরোধকারী, রক্ষাকর্তা

৯১ আরবী উচ্চারণঃ الضار বাংলা উচ্চারণঃ আয্-যর অর্থঃ যন্ত্রণাদানকারী, উৎপীড়নকারী

৯২ আরবী উচ্চারণঃ النافع বাংলা উচ্চারণঃ আন্-নাফিই' অর্থঃ অনুগ্রাহক, উপকর্তা, হিতকারী

৯৩ আরবী উচ্চারণঃ النور বাংলা উচ্চারণঃ আন্-নূর অর্থঃ আলোক

৯৪ আরবী উচ্চারণঃ الهادي বাংলা উচ্চারণঃ আল-হাদী অর্থঃ পথপ্রদর্শক

৯৫ আরবী উচ্চারণঃ البديع বাংলা উচ্চারণঃ আল-বাদীই' অর্থঃ অতুলনীয়, অনিধগম্য

৯৬ আরবী উচ্চারণঃ الباقي বাংলা উচ্চারণঃ আল-বাক্বী অর্থঃ অপরিবর্তনীয়, অনন্ত, অসীম, অক্ষয়

৯৭ আরবী উচ্চারণঃ الوارث বাংলা উচ্চারণঃ আল-ওয়ারিস' অর্থঃ সবকিছুর উত্তরাধিকারী

৯৮ আরবী উচ্চারণঃ الرشيد বাংলা উচ্চারণঃ আর-রাশীদ অর্থঃ সঠিক পথের নির্দেশক

৯৯ আরবী উচ্চারণঃ الصبور বাংলা উচ্চারণঃ আস-সবুর অর্থঃ ধৈর্যশীল
Thanks for reading this post. For any quary contact with us by WhatsApp https://chat.whatsapp.com/Fx5E2Otzhqn4nIBXRXpsFk

রবিবার, ৬ মার্চ, ২০২২

হযরত মুহাম্মাদ সাঃ এর জীবনী


প্রাক-ইসলামী যুগে যখন চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, পাপাচার, দুরাচার, ব্যাভিচার, মিথ্যা, হত্যা, লুন্ঠন, মদ্যপান, জুয়ায় ভরপুর ছিল। অন্যায়-অপরাধ, দ্বন্ধ-সংঘাত, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, নৈরাশ্য আর হাহাকার বিরাজ করছিল ঠিক এমন সময় মানবতার মুক্তির দিশারী সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সারা জাহানের হিদায়েতের জন্য আবির্ভূত হলেন। রাসুল (সাঃ) হলেন বিশ্ব মানতার জন্য আল্লাহর এক অনন্য রহমত স্বরুপ প্রেরিত। মহান বিশ্ব পরিচালক ঘোষণা করেনছেন, “আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি বিশ্ব জগতের জন্য বিশেষ রহমত স্বরুপ।”

 


জন্ম ও শৈশবঃ


হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ৫৭০ খৃীস্টাব্দে ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম আমিনা এবং পিতার নাম আব্দুল্লাহ। অতি অল্প বয়স থেকেই আল্লাহ তাকে কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে নেন। জন্মের পূর্বে পিতা, ৬ বছর বয়সে মা আমিনাকে হারান। এবং ৮ বছর বয়সে তার দাদা মৃত্যু বরণ করেন। ইয়াতীম শিশু বড় হয়ে উঠে চাচার সযত্ন ভালবাসায়।


নামকরণঃ  


হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম হওয়ার পরই মা আমেনা এ সংবাদ দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে পাঠান। সংবাদ পাওয়ার পরেই তিনি ছুটে আসেন। পরম স্নেহে দেখেন, যত্নের সঙ্গেঁ কোলে নিয়ে কা’বার ভেতর প্রবেশ করেন, আল্লাহর হামদ বর্ণনা করেন এবং দোয়া করেন। অতঃপর তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’(প্রশংসিত)।


আহমদ নামকরণঃ


বিবি আমিনা গর্ভাবস্থায় স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত নাম অনুসারে ‘আহমদ’ (উচ্চ প্রশংসিত’) নাম রাখেন। বাল্যকাল হতে মুহাম্মদ ও আহমদ উভয় নামি প্রচলিত ছিল। উভয় নামই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে।


দুগ্ধ পান কালঃ


সর্ব প্রথম তাঁকে তাঁর মাতা হযরত আমেনা দুগ্ধ পান করান। অতঃপর আবু লাহাবের বাঁদী ‘সুওয়াইবা’ তাকে দুগ্ধ পান করায়। অতঃপর ধাত্রীর সন্ধান করতে থাকেন। ‘হাওয়াযিন’ গোত্রের বানী সা’দ এর মহিলা হালীমা ছা’দিয়া এই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হন। এমন ভাবে যে, অন্য কোন ধাত্রী শিশু মুহাম্মদকে গ্রহণ করলনা পক্ষান্তরে হালীমা সাদীয়াও অন্য কোন শিশু পেলনা। ফলে বাধ্য হয়ে রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম কে গ্রহণ করলেন। গ্রহণ করার পর থেকেই হালীমার ঘরে ইলাহী বরকতের জোয়ার শুরু হল। দুবছর দুগ্ধ পানের পর বিবি হালীমা শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে তাঁর মায়ের নিকট হাজির হন এবং সাথে সাথে এই আকাঙ্খাও ব্যক্ত করেন যে, শিশুকে আরো কিছু দিনের জন্য তাঁর নিকট যেন থাকতে দেয়া হয়। এদিকে মক্কায় তখন মহামারী চলছিল। উভয় দিক চিন্তা করে বিবি আমেনা তাঁর শিশুকে হালীমার নিকট ফিরিয়ে দেন। এমনি ভাবে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত হযরত মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম বানী সাদে লালিত পালিত হন। সেখানে তিনি তাঁর দুধ ভাইদের সঙ্গে জঙ্গঁলে ছাগল চরাতেন। (সহীহ আল বুখারী, কিতাবুন নিকাহ, সীরাতুননবীঃ ১/১৭২)


দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধানেঃ


হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর মাতা-পিতার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব নেন। তিনি তাকে খুব স্নেহ করতেন। এমনকি নিজের ছেলেদের উপরও তাঁকে প্রাধান্য দিতেন। নিজের আসনে বসাতেন। দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্তই তিনি তাঁর তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। তখন তার বয়স ছিল আট বছর। তিনি চাচা আবু তালিবকে বকরী লালন-পালন ও শাম দেশের ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করতেন।


খাদীজা (রাঃ) এর সঙ্গে বিবাহঃ


পঁচিশ বছর বয়সে মক্কার ধনবতী মহিলা খাদিজা বিনতে খোয়ালিদের সাথে রাসূল (সাঃ) এর বিয়ে হয়। অভিজাত সতী, ধনবতী, মহিলা খাদিজা বিভিন্ন লোককে পণ্য দিয়ে ব্যবসা করাতেন এবং তিনি লাভের একটা অংশ গ্রহণ করতেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সততা, সত্যবাদীতা ও বিশ্বস্ততা তখন সুবিদিত ছিল। আল-আমীন, আসসাকিন এর প্রশংসা শুনে তিনি তার কাছে ব্যবসার প্রস্তাব পাঠান। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) রাজী হন এবং ব্যবসা শেষে অনেক বেশি লাভসহ তার সব কিছু বুঝিয়ে দেন।


রাসূলের গুণ মুগ্ধ ও অলৌকিক সংকেতের কথা শুনে মা খাদিজা বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় এবং উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তখন খাদিজার বয়স ছিল ৪০ বছর। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন রাসূল (সা:) আর কোনো বিয়ের প্রয়োজন অনুভব করেননি। এরপর আদর্শিক প্রয়োজনে এবং নারী সমাজের বিভিন্ন উপকারের জন্য তিনি মোট ১১টি বিয়ে করেন। দু’জন তার মৃত্যুর পূর্বে মারা যান আর ৯ জনের সাথে তিনি বৈবাহিক জীবন অতিবাহিত করেন।


শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সাঃ)


মহা গ্রন্থ আল কোরআন, ইতিহাস এর যুক্তি-প্রমাণ এবং বিভিন্ন গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী রমজান মাসের শেষ পর্যায়ে মহানবী (সাঃ) এর কাছে আল্লাহর দূত জিবরাইল (আ:) কে দিয়ে ওহী (আল্লাহর বাণী) প্রেরন করেন। এ সময় তার বয়স ৪০ পূর্ণ হয়। প্রথমে তিনি স্বপ্নে সে নিদর্শন পান এবং পরে সরাসরি পেয়েছিলেন।


ওহী নাযিলের সূচনাঃ


বেশীর ভাগ সময় তিনি মক্কার প্রসিদ্ধ পাহাড় ‘জাবালে নূরে’ অবস্থিত ‘গারে হেরা’ তথা হেরা গুহায় অবস্থান করতেন এবং ক্রমান্বয়ে কয়েক রাত সেখানে অতিবাহিত করতেন। থাকার ব্যবস্থাও তিনি আগে থেকেই করে নিতেন। এভাবে একদা তিনি হেরা গুহায় তাশরীফ আনেন এমন সময় তাঁকে নুবুওয়াতের পদমর্যাদা দিয়ে সৌভাগ্যবান করার পবিত্র মুহুর্ত এসে যায়। জন্মের ৪১ তম বছরে ২৭ ই রজব (হিজরতের ১৩ বছর পূর্বে) মুতাবিক ৬১০ খৃষ্টাব্দ তারিখে জাগ্রত ও চৈতন্য অবস্থায় এঘটনা সংঘটিত হয়। আল্লাহর ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) প্রথমবারের মত তাঁর কাছে, পৃথিবীবাসীদের জন্য আল্লাহর সর্বশেষ ঐষীবাণী, বিশ্বমানবতার মুক্তির পথের দিশারী, জ্বিন ও ইনসানের জন্য পরিপূর্ণ জীবন বিধান ‘আল্ কুরআনুল কারীম’ এর সর্বপ্রথম কথাগুলো নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন।


“পড় তোমার প্রতিপালকের নামে

তাঁর সামনে হেরা গুহায় ফেরেশতা আগমন করেন এবং বলেনঃ পড়ুন। তিনি উত্তর দিলেন আমি কি ভাবে পড়ব? ফেরেশতা বললেনঃ

‘পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে, তোমার পালনকর্তা মহা দয়ালু।’

যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না”। (সূরা আলাকঃ ১-৫।)


মি‘রাজ তথা উর্দ্ধারোহনঃ

রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর বয়স যখন ৫১ বছর নয় মাস হয়, তখন তাঁকে সশরীরে মর্যাদাপূর্ণ ইসরা ও মি’রাজ ভ্রমণের মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়। মি’রাজে রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রথমে কা’বা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে যান, অতঃপর সেখান থেকে এক এক করে সাত আসমান অতিক্রম করে মহান আল্লাহর আরশে আজীমে তাশরীফ গ্রহণ করেন। এ মি’রাজ সফরে রাসুলুল্লাহ (সঃ) পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে বিধান লাভ করেন। মি’রাজে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) জান্নাত এবং জাহান্নাম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন।


দাওয়াতের আদেশঃ


মহান আল্লাহ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইসলামের দাওয়াতের আদেশ দিয়ে ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ﴿১﴾ قُمْ فَأَنْذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ﴿৩﴾ . (سورة المدثر)

হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! ওঠ এবং সতর্ক কর।


গোপনে ইসলামের দাওয়াতঃ


রাসলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ যথাযথ পালন করেন এবং গোপনে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি সর্বপ্রথম আপন পরিবার- পরিজন ও বন্ধু-বর্গকে ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম খাদীজা রা. তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম আবূ বকর সিদ্দীক (রা), ছোটদের মধ্যে আলী ইবনে আবূ তালিব রা. এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেসা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন বছর পর্যন্ত গোপনে তার নিকটস্থ’ লোকদের মাঝে ইসলাম প্রচার করেন।


প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতঃ


তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেয়ার পর মুহাম্মাদ প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। নবী (সাঃ) সাফা পর্বতের ওপর দাড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল। এই সময় থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়।


ধৈর্য ও অবিচলঃ


মুসলমানগণ মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও নিপীড়ন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করতেন। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে সাওয়াব ও জান্নাত লাভের আশায় বিপদে ধৈর্য ধারণ ও অনড় থাকার পরামর্শ দেন। মুশরিকদের নির্যাতন ভোগ করেছেন এমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সাহাবী হলেন : বিলাল ইবনে রাবাহ ও আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. প্রমুখ। মুশরিকদের নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ইয়াসির ও সুমাইয়া রা. এবং ইসলামের ইতিহাসে তারাই সর্বপ্রথম শহীদ।


আল-আমীন উপাধি লাভঃ


হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বাল্যকাল হতেই চিন্তামগ্ন থাকতেন। তিনি ছিলেন দুর্দশাগ্রস্থ ও নিপিড়ীত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল। আরববাসী তার নম্রতা, বিনয়, সত্যবাদিতা ও সৎস্বভাবের জন্য তাঁকে ‘আল-আমীন’ বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করেন।


তায়েফ গমনঃ


হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আশ্রয়দাতা চাচা আবূ তালিবের মৃত্যুকে কুরাইশরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। তার উপর নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিল। এ কঠিন পরিস্থিতে সহযোগিতা ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় তিনি তায়েফ গমন করলেন। কিন্ত সেখানে উপহাস ও দুর্ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পাথর নিক্ষেপ করে আহত করে। ফলে তিনি আবার মক্কায় ফিরে যান।


মদিনায় হিজরতঃ

কুরাইশরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে হেফাযত করেন।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) স্বীয় ঘর থেকে বের হন এবং আল্লাহ তাআলা কাফেরদের চক্ষু অন্ধ করে দেন যাতে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে না পারে। তিনি চলতে চলতে মক্কার বাইরে আবু বকর সিদ্দীক রা. এর সাথে মিলিত হন। অতঃপর তারা এক সাথেই পথ চলা আরম্ভ করেন। সওর নামক পাহাড়ে পৌঁছে একটি গুহায় তিন দিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেন। এ সময়টিতে আব্দুল্লাহ বিন আবূ বকর রা. তাদের নিকট কুরাইশদের সংবাদ পৌঁছাতেন এবং তার বোন আসমা খাদ্য ও পানীয় পৌঁছে দিতেন। তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সঙ্গী আবু বকর (রা) গুহা হতে বের হন এবং মদীনার পথে যাত্রা শুরু করেন।


মদীনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনাঃ


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় পৌঁছে তাকওয়ার ভিত্তিতে ইসলামের সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে মদীনা শরীফে এ মসজিদটি “মসজিদে কু’বা” নামে পরিচিত।

মদীনাতে রাসুল (স) সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হলো মসজিদে নববী নির্মাণ এবং আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন।


মক্কা বিজয়ঃ


হুদায়বিয়ার সন্ধির পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিভিন্ন গোত্রে তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচী অধিক পরিমাণে বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে এক বছরের মাথায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মাঝে কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ বনু বকর মুসলমানদের মিত্র কবীলায়ে খুযা‘আর উপর আক্রমণ করল। এর অর্থ দাঁড়াল কুরাইশ এবং তার মিত্ররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করল।

নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদ পেয়ে অত্যধিক ক্রুদ্ধ হন এবং মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে দশ হাজার যোদ্ধার একটি বিশাল সেনাদল গঠন করেন।


তখন ছিল হিজরী অষ্টম বর্ষের রমযান মাস। এদিকে কুরাইশরা নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মক্কাভিমুখে অভিযানের সংবাদ পেয়ে তাদের নেতা ও মুখপাত্র আবূ সুফিয়ানকে ক্ষমা প্রার্থনা, সন্ধি চুক্তি বলবৎ এবং চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট প্রেরণ করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিলেন। কারণ তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। আবূ সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ ব্যতিত আর কোন উপায় না দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর সেনাদল (মক্কাভিমুখে) রওয়ানা হয়ে মক্কার কাছাকাছি আসলে মক্কাবাসী বিশাল দল দেখে আত্মসমর্পণ করে। আর নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন।


নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন এবং নিজ হাতের লাঠি দ্বারা কা‘বার আশেপাশে রাখা সকল প্রতিমা ভেঙে চুরমার করে দেন। আর স্বীয় রবের শেখানো আয়াত পাঠ করতে থাকেন,


وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا-


“বল, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (সূরা ইসরা : ৮১)

অতঃপর নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ঘোষণা করেন মক্কা পবিত্র ও নিরাপদ।


বিদায় হজ্জঃ

দশম হিজরী সনে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে তাঁর সাথে হজব্রত পালন ও হজের আহকাম শিক্ষা গ্রহণ করতে মক্কায় যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান।

قول الله تعالى : الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا (سورة المائدة : ৩)

তাঁর আহ্বানে লক্ষাধিক সাহাবি উপস্থিত হলেন। তাঁরা যুলকা’দাহ্‌ মাসের পঁচিশ তারিখ তাঁর সাথে মক্কা পানে বের হন। বাইতুল্লায় পৌঁছে প্রথমে তওয়াফ করেন। অতঃপর যিলহজ্জ মাসের আট তারিখ মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এরপর নয় তারিখ জাবালে আরাফাহ অভিমুখে যাত্রা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে অবস্থান করেন এবং মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক অমর ভাষণ দান করে তাদেরকে ইসলামী বিধি-বিধান ও হজের আহকাম শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করেন- “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”


বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে মুহাম্মদ (স) জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচন্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। অসুস্থতা তীব্র হওয়ার পর তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আয়েশা (রাঃ)এর কামরায় অবস্থান করতে থাকেন। তাঁর কাছে সাত কিংবা আট দিনার ছিল,মৃত্যুর একদিন পূর্বে তিনি এগুলোও দান করে দেন। অবশেষে ১১ হিজরী সালের রবিউল আউয়াল মাসের ১ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি মহান প্রতিপালকের সান্নিধ্যে চলে যান। এ সময় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।


সর্বোপরি, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্টায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেন, সর্বক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সফল ব্যক্তিত্ব।


ঐতিহাসিক গিবনের ভাষায়,


If all the world was united under one leader, Muhammad would have been the best fitted man to lead the peoples of various creeds, dogmas and ideas to peace and happiness.

“সমগ্র দুনিয়াটাকে যদি একত্র করে একজনের নেতৃত্বে আনা যেত তাহলে নানা ধর্মমত, ধর্ম বিশ্বাস ও চিন্তার মানুষকে শান্তি সুখের পথে পরিচালনার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-ই হবেন সর্বোত্তম যোগ্য নেতা।”




জনপ্রিয় পোস্ট